মিটিয়ে দেব লেনা দেনা- মনদীপ ঘরাই

 



প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেল ওয়েটিং রুমে বসে আছে শাওন। আজ এ অফিসের বস মির্জা সাহেবের সাথে দেখা না করে সে যাবে না। এর আগেও দু’দিন এসে ঘুরে গেছে। আজ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে লোকটাকে একটা ক্রেডিট কার্ড করানোতে রাজি করাতে। অপেক্ষার প্রহর যখন দুই ঘন্টা ছুঁই ছুঁই, ঠিক তখনই এক পিয়ন এসে ডাক দিলো শাওনকে। শাওন পকেটে থাকা টিস্যু দিয়ে মুখে জমে থাকা ঘাম মুছে মির্জা সাহেবের রুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। দরজা ঠেলে খুলতেই ঠান্ডা এসির বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে গেল তার। মির্জা সাহেবের গম্ভীর কন্ঠ কানে ভেসে এলো,
“ভেতরে আসুন”
শাওন সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকে বসলো। কেমন আছেন কিংবা শরীর কেমন এসব ভূমিকা বাদ দিয়ে সরাসরি কাজের কথা শুরু করতে গেল সে, “স্যার, আমি এসেছিলাম টিবিএল থেকে। আমাদের ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের কিছু সুবিধা আপনাকে বলতে চাচ্ছিলাম”
হাত উঁচু করে শাওনকে থামিয়ে দিয়ে মির্জা সাহেব বললেন, “ এতটা প্রফেসনাল হলে তো চলবে না! কুশল-পরিচয় ছাড়াই ক্রেডিট কার্ডের গুণ গাইতে শুরু করে দিলেন। নাহ্ । হবে না”
কী হবে না, কেন হবে না সেটা বুঝতে না পেরে নিরাপদ পথেই হাঁটলো শাওন, “স্যরি স্যার। আমার নাম আফজাল হোসেন শাওন”
একটু আগে পরিচয় নিয়ে আগ্রহ দেখানো মির্জা সাহেব মুহূর্তেই শাওনকে ভুলে মাথা ডোবালেন ল্যাপটপের স্ক্রিনে। আর শাওন যন্ত্রের মতো বলে যেতে লাগলো একের পর এক অফার।
হঠাৎ কী যেন একটা শুনে চোখ তুলে তাকালেন মির্জা সাহেব। বললেন, “ কী বললেন যেন? নিসর্গ রিসোর্টের ডিসকাউন্ট আছে?”
শাওন খুশিতে গদগদ হয়ে বললো, “জ্বি স্যার। একেবারে ৩০% ডিসকাউন্ট”
এরপর আর কোন কথা খরচ করতে হয় নি শাওনকে। টিবিএল এর ক্রেডিট কার্ড নিয়েছেন মির্জা সাহেব। সকাল থেকে তিনজনকে ক্রেডিক কার্ড সেল করতে পেরেছে সে। বড় দার্শনিক না হলেও শাওনের নিজের একটা মতবাদ আছে। মনে মনে সেটা একবার ঝালিয়ে নিলো সে:
“ বর্তমান জগতটা লেনদেন এর। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়া এ জগতে কোন মানুষ নেই। আর পকেটে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া কোন বুদ্ধিমান মানুষ নেই।“

২.
মাস ছয়েক আগে হবে হয়তো। মির্জা সাহেব নামে কারো কাছে একটা ক্রেডিট কার্ড দিয়েছিলো শাওন। এই লোকটা আর সবার থেকে ফোনে বড্ড বেশি জ্বালাচ্ছে। তার নাকি হিডেন চার্জ কেটে নিচ্ছে। আরে ব্যাটা! টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনের পেপার স্বাক্ষর করার আগে পড়ে দেখিস নি কেন! সেটাও কী আমার দোষ! নিসর্গ রিসোর্টের ডিসকাউন্ড দেখে তখন তো আর কিছুই চোখে পড়ে নি! মনে মনেই কথাগুলো বলে মির্জা সাহেবের কলটা রিসিভ করলো শাওন
“জ্বি স্যার , বলুন”
“সালাম টালাম বাদ দিয়ে এখন জ্বি স্যার! বাহ্। কি বাটপারিটা করছে এই ব্যাংক। শোনো, তুমি আজকের মধ্যে আমার কার্ড বন্ধ করে দিবা”
“স্যরি স্যার। আপনি ৯৮৪৫৪ নাম্বারে ফোন দিয়ে কথা বলুন। এটা আমার কাজ না”
“কত বড় বেয়াদব। কার্ড দেয়ার সময় মনে ছিলো না!
কথা বাড়তে না দিয়ে লাইনটা কেটে মোবাইলটা সাইলেন্ট করে দেয় শাওন। এখন তাকে অমি গ্রুপে যেতে হবে। ওখানে তিন-চারটা কার্ড এর সাবস্ক্রিপশন আসতে পারে।
মোবাইলের স্ক্রিনটার দিকে অজান্তেই চোখ পড়তে দেখলো মির্জা সাহেব না, মা কল দিচ্ছে। কাজের সময় মায়ের ফোন কেটে দেয়াটাই অভ্যাস শাওনের। সেই কাজটাই করে অমি গ্রুপের গুলশানের অফিসের দিকে রওনা দিলো সে। এমন এক ঢাকার স্বপ্ন দেখে শাওন, যেখানে সবার হাতে টিবিএল এর ক্রেডিট কার্ড থাকবে; আর মাধ্যমটা হবে সে।
৩.
প্রথম কবে ধারের ফাঁদে পড়েছিলো শাওন, তা আর মনে পড়ে না। বোনের পরীক্ষার ফি অথবা মায়ের ওষুধের জন্য হয়তো। বাবা মারা যাওয়ার পর অনেক কষ্ট করে সংসার চালিয়েছে শাওন। টিউশনি করে পড়ালেখা আর ঘর সামলানোর কষ্টের কথা মনে পড়লে বর্তমান চাকরিকে স্বর্গের সমান মনে হয় তার। এর কাছ থেকে-ওর কাছ থেকে ধার নেয়ার অভ্যাসটা তখন থেকেই। এরপর একসময় চাকরি একটা পেয়ে বেতনের বিপরীতে প্রথম ক্রেডিট কার্ডটা নিয়েছিলো শাওন। সেই থেকে আজ অবধি তার ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা পাঁচ। একটা থেকে টাকা তুলে আরেকটার মাসিক টাকা শোধ করার নজিরও আছে অহরহ। শাওন খুব ভালোই বুঝে গেছে, ক্রেডিট কার্ড আর ধারের এই চক্র থেকে সে বের হতে পারবে না আর কখনো। এখন সে পেশাগতভাবেই তার দল ভারি করছে। মানুষকে কথা আর অফারের ছলে ভুলিয়ে ঋণের জগতে টেনে আনছে। যে জগতে ঢুকতে একটা মোটামোটি অঙ্কের বেতন বা আয় লাগে শুধু, আর বের হতে? সে পথটা শাওনেরও জানা নেই।
৪.
রাইড শেয়ারিং বাইকে তেমন একটা ওঠে না শাওন। আজ কেন যেনো বাসে উঠতে ইচ্ছে করছিলো না। অফিসের সামনের রাস্তার মাথায় এসে দেখলো কয়েকটা বাইক দাঁড়ানো। কাছে যেতেই মনে পড়লো মোবাইলে অ্যাপ ডাউনলোড করা নেই। ওর দ্বিধাটা বুঝতে পেরে পান খাওয়া দাঁত বের করে এক বাইকার বললো, “ভাইজান, অ্যাপ লাগবে না। আমরা খ্যাপে যাই”
উঠে বসলো শাওন। মগবাজার ফ্লাইওভারের উপরে বাইক উঠতেই শাওনের কেমন যেন গা ছমছম করতে লাগলো। হঠাৎ বাইকার বাইকটা থামিয়ে পেছন ফিরেই চাকু ঠেকালো শাওনের পেটে। কোন কথাবার্তা ছাড়াই শুধুমাত্র ইশারাতে সব কাজ হলো। শাওন মোবাইল, ঘড়ি, মানিব্যাগ দিয়ে ভদ্র ছেলের মতো নেমে হাঁটা শুরু করলো। ছিনতাইকারী বাইকার এক টানে অদৃশ্য হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে।দরদর করে ঘামছে শাওন। কতক্ষণ হেঁটে যে সে বাসায় পৌঁছালো, তা আর মনে নেই। শাওনের টাকা, মোবাইল, মানিব্যাগের চিন্তা ছাপিয়ে শুধু মনে হলো; পাঁচটা ক্রেডিট কার্ডের একটাও নেই! সে রাতে মারাত্মক জ্বর উঠেছিলো তার । আর সারারাত বসে মাথায় পানি ঢালছিলেন মা।
৫.
ক্রেডিট কার্ডের সেলস ডিভিসনে চাকরিটা খারাপ চলছিলো না শাওনের। বোনের বিয়ে দেবার পরিকল্পণা পর্যন্ত করে রেখেছিলো সে। সব এলোমেলা হয়ে গেল। অন্যগুলো থেকে না পারলেও একটা কার্ডের লিমিট পর্যন্ত অনলাইনে ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট করেছে ছিনতাইকারীরা। এখন সেই টাকাগুলো শাওনের শোধ করতে হবে। থানায় একটা জিডি করেছ সে পরদিনই।
সবকিছু মিলিয়ে তার মন-মেজাজ দুটোই বেশ খারাপ থাকে ইদানিং। অফিসে বা ক্লায়েন্টদের সাথে এতোকিছুর পরেও হাসিমুখে কথা বলতে হয়। বাসায় এসে আর মেজাজ ধরে রাখতে পারে না। মায়ের সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে শাওন। তরকারিতে লবণ কম থেকে শুরু করে বাথরুমের স্যান্ডেল জায়গায় না থাকা নিয়ে মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। সেই সাথে আর একটা চিন্তা মাথায় জেঁকে বসেছে: মিটাতে হবে সব দেনা।
আজকেও বাসায় ফিরে বাথরুমে তোয়ালে না থাকায় মায়ের সাথে দুর্ব্যবহারের শুরু। সেটা গিয়ে গড়ায় খাবার টেবিলে। ইদানিং মা রীতিমতো ভয় পান শাওনকে। কোন কথার বিপরীতে জবাবও দেন না ভয়ে। আজ খাবার টেবিলে বসে মা হঠাৎ করে বলে বসেন,
“বাবা, তোর নিশ্চয়ই বড় কোন বিপদ। আমি বুঝতে পারি। তাই তুই আমার সাথে রাগারাগি করিস। আমি কিচ্ছু মনে করি না। তুই সেইদিন রাগের মাথায় বলসিলি যে তোর নাকি অনেক দেনা। আমার তো কিছুই নাই রে বাবা, তোর আর শিমুলের বিয়ের জন্য কিছু টাকা জমাইছিলাম। এই সামান্য টাকাগুলা নে। দেখ তোর যদি একটুও উপকারে আসে!”
মা তাঁর আঁচল খুলে মোড়ানো কিছু নোট শাওনের হাতে তুলে দেয়। শাওনের ভাতের প্লেটে ফোঁটায় ফোঁটায় চোখের জল পড়ছে। মা ও আঁচলে মুখ লুকিয়ে তাঁর শোবার ঘরে চলে যান।
সে রাতে আর ঘুমাতে পারে নি শাওন। আর শেষ রাতে ঘুমের মধ্যেই হৃদরোগে মারা যান শাওনের মা।
শাওনের জগতটা পুরোপুরি বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। ভাঙ্গা আয়নার টুকরোগুলোর মতো। তবে যাবার আগে মা তার সমস্ত দেনাগুলো মিটিয়ে দিয়ে গেছেন। সেদিনের রাতে মায়ের দেয়া সেই টাকা, মায়ের গলার চেইন আর হাতের দুটো চুড়ি দিয়ে সব ধার শোধ করেছে শাওন।
আগের মতো শাওন আর ওই কথাটা বলে না। জগতের সবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ড থাকার প্রয়োজন নেই। বর্তমান জগতটা লেনদেনের নয়। কখনও হবেও না। জগতটা ভালোবাসার । জগতটা মমতার। শাওনের সব লেনাদেনা মিটিয়ে দিয়ে গেছেন মা। মায়ের কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিলো না...

সুত্র: ফেসবুক পেজ- মনদীপ ঘরাই স্যারের।

Comments :

Post a Comment